সাত দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র **শরীফ ওসমান হাদি**। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ৩২ বছর বয়সী এই তরুণ নেতার মৃত্যু সংবাদে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশজুড়ে, অন্যদিকে খুনিদের বিচারের দাবিতে আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজপথ।

### ঘটনার প্রেক্ষাপট

গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে নির্বাচনী প্রচারণার সময় হাদির ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। মোটরসাইকেলে আসা দুই হামলাকারী খুব কাছ থেকে তার মাথায় গুলি করে পালিয়ে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে গত ১৫ ডিসেম্বর সরকারি উদ্যোগে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছিল। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতের কারণে তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

### জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ ও রাষ্ট্রীয় শোক

হাদির মৃত্যুর পর বৃহস্পতিবার রাতেই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা **ড. মুহাম্মদ ইউনূস**। তিনি হাদিকে 'শহীদ' হিসেবে অভিহিত করে বলেন, "হাদি ছিলেন জুলাই বিপ্লবের এক অকুতোভয় সৈনিক। যারা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বিপ্লবের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।"

প্রধান উপদেষ্টা মরহুমের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং আগামী **শনিবার (২০ ডিসেম্বর) দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক** পালনের নির্দেশ দেন। এছাড়া শুক্রবার জুমার নামাজের পর সারা দেশের মসজিদে বিশেষ দোয়া ও অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।

### বিক্ষোভ ও উত্তাল পরিস্থিতি

মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ঢাকার শাহবাগ মোড়ে জড়ো হতে শুরু করেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। "আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে?", "হাদি ভাইর রক্ত, বৃথা যেতে দেব না"—এমন সব স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। বিক্ষোভকারীরা এ ঘটনার পেছনে বিদেশি মদদপুষ্ট গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

### আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্ব

হাদির মৃত্যুর খবর আল জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স ও সিএনএন-এর মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে একজন সম্ভাবনাময় প্রার্থীর ওপর এমন হামলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

### মরদেহের অপেক্ষায় দেশবাসী

শুক্রবার বিকেলেই হাদির মরদেহ সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষ বিমানে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চ সূত্রে জানানো হয়েছে, আগামীকাল (শনিবার) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে এবং এরপর তাকে তার নিজ গ্রামে দাফন করা হবে।

---

**বিশেষ দ্রষ্টব্য:** আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সকলকে শান্ত থাকার এবং কোনো ধরনের উসকানিতে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

---