জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের নতুন সরকারের ভিশন তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করার সম্ভাবনা রয়েছে তার। এ সময়ে জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বনেতাদের সঙ্গেও বিভিন্ন বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এসব তথ্য জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ কর্মসূচি বিস্তারিত জানানো হবে। আমরা সম্ভবত ২১ তারিখ রওনা হব এবং ২৬ তারিখ পর্যন্ত নিউইয়র্কে থাকব। সেখানে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাবেন। তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভিশন তুলে ধরবেন—নতুন বাংলাদেশ কেমন হবে, তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপিকে সরকারে নির্বাচিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চান, সে বিষয়ে তার ভিশন জাতিসংঘে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন।’
বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্বশান্তি, টেকসই সমাধান ও সংঘাত নিরসনে বাংলাদেশের ভূমিকার কথাও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে থাকবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে দারিদ্র্য দূরীকরণ, স্থানীয় অর্থনীতিতে মানুষের আকাঙ্ক্ষা তৈরি, বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ এবং জলবায়ু নিরাপত্তা ও জলবায়ু অর্থায়নে বাংলাদেশের নেতৃত্বের বিষয়গুলোও ভাষণে স্থান পেতে পারে।
হুমায়ুন কবির বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তবে কার কার সঙ্গে বৈঠক হবে, তা চূড়ান্ত হতে সময় লাগতে পারে। বহুপক্ষীয় ফোরামে এ ধরনের বৈঠক শেষ মুহূর্তেও নির্ধারিত হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এছাড়া রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সাইডলাইনে একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা আয়োজন করা হবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি ‘টপ প্রায়োরিটি’ এবং জাতিসংঘের ৭৯তম সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের ক্ষেত্রেও এটি অগ্রাধিকার পাবে। এই সংকটের বিষয়ে সচেতনতা ও আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা পুরো সভাপতিত্বের সময়জুড়ে অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
জাতিসংঘ সফরের আগে বা সাইডলাইনে ভারতের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে ভালো ও কার্যকর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাংলাদেশ একটি দ্বিপক্ষীয় সফরকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো বহুপক্ষীয় ফোরামে গিয়ে অন্য দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে না।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলিনি যে প্রতিটি বহুপক্ষীয় জায়গায় গেলে আমরা কাউকে মিট করব না। দুটি বিষয় আলাদা।’
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা একটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চাই। আমরা সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চাই। এতদিন একটি ঝামেলাগ্রস্ত, ত্রুটিপূর্ণ, লুটেরা, স্বৈরাচার সরকারের সঙ্গে ১৫ বছরের সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে এখন একটি নতুন সম্পর্কের দিকে যাব। এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমেই করব।’
তবে জাতিসংঘের মতো বহুপক্ষীয় ফোরামে ভারতের সঙ্গে কোনোভাবেই বৈঠক হবে না—এমন ধারণা ঠিক নয় বলে জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে বহুপক্ষীয় যেকোনো জায়গায় গেলে প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণে আমরা সাইডলাইনে বৈঠক করব না। সেটি কখনই বলা হয়নি।’
ভারত প্রসঙ্গে একের পর এক প্রশ্ন না করে নিজেদের দেশের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ডেইলি ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট খাইতেই ইন্ডিয়া, লাঞ্চ খাইতেই ইন্ডিয়া, ডিনার খাইতেই ইন্ডিয়া—তাহলে ভাই, আপনার নিজের দেশের খাবার কোন সময় খাবেন? খালি যদি ইন্ডিয়া ইন্ডিয়া করেন! নিজের দেশের চিন্তা করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘যার সঙ্গে যখন আমাদের দ্বিপক্ষীয় (বৈঠক) করতে হবে, বহুপক্ষীয় ফোরামে গিয়ে কথা বলতে হবে, আমরা তা করব। যেখানে যে সুযোগ থাকবে, আমরা সম্পৃক্ত হব। নেতারা সবার সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। অনেক আমন্ত্রণ থাকে। সাইডলাইনে অনেক অনুষ্ঠানে আমরা অংশ নেব।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাইডলাইনে বৈঠকের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মূল লক্ষ্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়া। সাইডলাইনে কার সঙ্গে বৈঠক হবে, তা শেষ মুহূর্তেও নির্ধারিত হতে পারে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘বহুপক্ষীয় ফোরাম এভাবেই কাজ করে। একজন নেতা শেষ মুহূর্তেও বলতে পারেন, আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাই। বড় বড় সম্মেলনে এমনটাই হয়। সাইডলাইনে বিশ্বনেতাদের দৈনন্দিন কর্মসূচিতে অনেক পরিবর্তন আসে। এসব যখন আসবে, যার সঙ্গেই বৈঠক হোক, আপনাদের জানানো হবে। আপনারাই প্রথম জানতে পারবেন।’
সীমান্তে হত্যাকাণ্ড ও বাংলাদেশিদের ধরে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলোর বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, এসব বিষয় কূটনৈতিকভাবে ভারতের জাতীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সীমান্ত ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও সীমান্ত প্রটোকল রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কাঠামোগত চুক্তিও রয়েছে। এসবের আওতায় উদ্বেগের বিষয়গুলো প্রতিটি পর্যায়ে তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি।
ভারতের সঙ্গে ১০১টি চুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং সংসদীয় কমিটিতে তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে চিফ হুইপের কাছে জানতে সাংবাদিকদের পরামর্শ দেন তিনি।
এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালকের পদে বাংলাদেশের অবস্থান এবং ওই পদে দুর্নীতির অনুসন্ধান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সদ্য পদত্যাগ করা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ওই নিয়োগই ‘দুঃখজনক’ ছিল। তার দাবি, তার এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের পদে নিয়োগ পাওয়ার মতো বিশ্বাসযোগ্য যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ছিল না। তিনি তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়ে ভুল তথ্য দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতা ও দক্ষতার ঘাটতির বিষয়গুলো সামনে আসবেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতির দুর্গন্ধ থামানো কঠিন, এটি বের হয়ে আসবেই।’ একই সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি।
সায়মা ওয়াজেদকে শুধু একটি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও কঠোর করা প্রয়োজন। কোনো পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যৎ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মালদ্বীপের একজন প্রার্থীকে সমর্থন করছে, যার ভালো যোগ্যতা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অদূর ভবিষ্যতে ডব্লিউএইচও উপযুক্ত নেতৃত্বের হাতে থাকবে।
দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফেরত আনার বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় অংশীদারের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করছে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও বাংলাদেশের এ বিষয়ে একটি অংশীদারত্ব রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ফরেনসিক ক্ষেত্রে দক্ষতা ও সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘কূটনীতির মাধ্যমে আমরা কাজ করব, যাতে বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে চুরি করা সম্পদ ও অর্থ উদ্ধার করা যায়। যাতে জনগণ তাদের অর্থ ফিরে পায় এবং সেই অর্থ তাদের জন্য ব্যয় করা হয়, তা বিদেশে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে।’


Comments (0)
Log in to join the discussion.
Be the first to comment.