২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ববাণিজ্য এক জটিল দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্পর্কিত ইলেকট্রনিক্স ও উপাদানের চাহিদা বাণিজ্যকে চাঙ্গা রাখছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, একতরফা শুল্ক আর সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন বাণিজ্যের প্রকৃত প্রবৃদ্ধিকে সীমিত করছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ও ইউএনসিটিএডির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য মূল্যের হিসাবে প্রায় ১২.৫ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু এর বড় অংশই মূল্যস্ফীতির কারণে; প্রকৃত পরিমাণগত ভিত্তিক প্রবৃদ্ধি অনেক ধীর।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি বাণিজ্যের ধাক্কা
হরমুজ প্রণালীর প্রায় বন্ধ অবস্থা এবং সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে ড্রোন হামলার পর পাইপলাইন সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই পাইপলাইন হরমুজকে বাইপাস করে লোহিত সাগরে তেল রপ্তানির মূল বিকল্প ছিল। ফলে সৌদি তেল রপ্তানি কমেছে এবং বৈশ্বিক তেলের দাম ১০০ ডলারের ঘরে উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে শুধু জ্বালানি নয়, সার, রাসায়নিক ও শিল্পের কাঁচামালের খরচও বাড়ছে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আমদানি বিল চাপের মুখে পড়ছে এবং মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে। শিপিং রুটগুলো এখন কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে—যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও খণ্ডিত করছে।

একতরফা শুল্ক ও ব্রিকসের জবাব
যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্ক নীতি এবং ইউরোপের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম)-এর মতো একতরফা ব্যবস্থাগুলোকে লক্ষ্য করেই ব্রিকস নেতারা নিউ দিল্লি ঘোষণাপত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, ডব্লিউটিওর নিয়মবিরুদ্ধ একতরফা শুল্ক ও অশুল্ক বাধা বাণিজ্যকে বিকৃত করছে, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে দিচ্ছে এবং বৈষম্য বাড়াচ্ছে। ব্রিকস দেশগুলো স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বৃদ্ধি, ডব্লিউটিও সংস্কার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। এটি মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর বাণিজ্য নীতির বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত কূটনৈতিক পাল্টা অবস্থান।

**বাণিজ্যের দ্বৈত চরিত্র**
ডব্লিউটিওর গুডস ট্রেড ব্যারোমিটার দেখাচ্ছে যে, জুনের পর থেকে পণ্য বাণিজ্য কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। এআই ও ডিজিটাল অবকাঠামোর চাহিদা এশিয়ার রপ্তানিকে সহায়তা করছে। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি, শুল্ক যুদ্ধ এবং শিপিং খরচ বৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংযত। ২০২৬ সালে পণ্য বাণিজ্যের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ১.৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে বলে ডব্লিউটিও আগে জানিয়েছিল; মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা আরও কমে যেতে পারে।

**বিশ্লেষণাত্মক পর্যবেক্ষণ**
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে যে, বিশ্ববাণিজ্য আর শুধু অর্থনৈতিক যুক্তিতে চলছে না—এটি ক্রমবর্ধমানভাবে ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তার বিষয় হয়ে উঠছে। একদিকে ব্রিকসের মতো জোট বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে চাইছে, অন্যদিকে শক্তিশালী অর্থনীতিগুলো একতরফা ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করছে। এর ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল আরও আঞ্চলিকীকৃত হচ্ছে, খরচ বাড়ছে এবং ছোট ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বাণিজ্য আরও কঠিন হয়ে উঠছে। আগামী মাসগুলোতে তেলের দাম, শুল্ক নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে বিশ্ববাণিজ্য কোন পথে এগোবে।