শরীফ ওসমান বিন হাদী হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ রোববার (৮ মার্চ, ২০২৬) ভোরে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—এই হত্যাকাণ্ডের মূল শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল (৩৭) এবং তাঁর সহযোগী আলমগীর হোসেন (৩৪)।

বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছি। হাদী হত্যার মূল আসামি ফয়সাল ও আলমগীরকে বনগাঁ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।”

ঘটনার বিবরণ ও তদন্ত:

গত ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে ঢাকার বিজয়নগর এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্র নেতা শরীফ ওসমান বিন হাদী (৩২) একটি রিকশায় চড়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত তাঁকে কাছ থেকে গুলি করে। তাঁর মাথায় গুলি লাগে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে এয়ারলিফ্ট করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ রাতে তিনি মারা যান।

এই হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, এই হত্যাকাণ্ডটি একটি পূর্ব-পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। তদন্তকারীরা দাবি করেন, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং মিরপুর এলাকার সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী (বাপ্পি) এই হত্যার নির্দেশ ও পরিকল্পনা দিয়েছিলেন। ফয়সাল করিম মাসুদ সরাসরি হাদী’র মাথায় গুলি করেছিলেন এবং আলমগীর হোসেন মোটরসাইকেল চালিয়ে তাঁকে সহযোগিতা করেছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যান। তাঁরা মেঘালয়, অসম হয়ে পশ্চিমবঙ্গে আত্মগোপন করেছিলেন।

ভারতে গ্রেপ্তার ও পরবর্তী পদক্ষেপ:

পশ্চিমবঙ্গ এসটিএফ জানিয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে যে, বাংলাদেশে চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় জড়িত দুই আসামি বনগাঁ সীমান্তে অবস্থান করছেন। তাঁরা আবারও অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে এসটিএফ একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাঁদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও কিছু ভারতীয় পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

তাঁদের আজ বিকেলেই বনগাঁ মহকুমা আদালতে পেশ করা হবে এবং পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করবে।

শরীফ ওসমান বিন হাদী ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্যও একটি সংবেদনশীল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে ‘শহীদ হাদী’র বিচার চেয়ে বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের সহায়তাও চেয়েছিল।

এই দুই মূল আসামির গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এই হাই-প্রোফাইল হত্যা মামলার তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতি হলো বলে মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, আসামিদের কত দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।