রাত পেরুলেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ পাঁচটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচনী প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন ও জেলা প্রশাসন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্সসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
কেন এই উপনির্বাচন?
ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনটি শূন্য হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সংসদ সদস্য পদ ছেড়ে দেওয়ার কারণে। গত ২০ আগস্ট ২০২৬ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরদিন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি একই সঙ্গে সংসদ সদস্য থাকতে পারেন না। এ কারণে আসনটিতে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
আসনটি ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী এলাকার সমন্বয়ে গঠিত। এই আসনের নতুন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব পূরণ হবে।
পাঁচ প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা হলেন—
১. **মির্জা ফয়সল আমীন** — বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), প্রতীক ধানের শীষ।
২. **দেলাওয়ার হোসেন** — বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, প্রতীক দাঁড়িপাল্লা।
৩. **মো. আবদুল আলীম নিযামী** — বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, প্রতীক বটগাছ।
৪. **হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক** — বাংলাদেশ কংগ্রেস, প্রতীক ডাব।
৫. **মো. খাদেমুল ইসলাম** — ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, প্রতীক হাতপাখা।
নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। এখন ভোটারদের উপস্থিতি, ভোটগ্রহণের পরিবেশ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার দিকে নজর রয়েছে প্রার্থী ও সাধারণ মানুষের।
মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন।
ভোটারদের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৭৫ জন, নারী ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন।
এ আসনে মোট ১৮৫টি ভোটকেন্দ্র এবং ৯৮৯টি ভোটকক্ষ রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা ও নির্বাচনী সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ভোটারদের নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে আসা এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করাই নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রধান লক্ষ্য।
নিরাপত্তায় ৫ হাজার ৩০০ সদস্য, সিসিটিভিতে নজরদারি
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রায় ৫ হাজার ৩০০ সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নির্বাচনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন।
নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১১৫টিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে নিরাপত্তাব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় নজরদারি এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
এর আগে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। সিসিটিভির পাশাপাশি ড্রোন ও বাহিনীর সদস্যদের শরীরে ধারণযোগ্য ক্যামেরা ব্যবহারের কথাও জানানো হয়েছিল।
বহিরাগতদের অবস্থানে নিষেধাজ্ঞা
নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ রাখতে ঠাকুরগাঁও-১ নির্বাচনী এলাকায় বহিরাগতদের অবস্থানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে জেলা প্রশাসন।
প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সকাল ৮টা থেকে ৩০ অক্টোবর বিকেল ৪টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা বা নিবন্ধিত ভোটার নন—এমন ব্যক্তিদের সেখানে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না। তবে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, নির্বাচন কমিশনের অনুমোদিত ব্যক্তি এবং এলাকার বাসিন্দা ও নিবন্ধিত ভোটারদের ক্ষেত্রে এ বিধিনিষেধ প্রযোজ্য নয়।
প্রশাসনের ভাষ্য, ভোটাররা যাতে কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা চাপ ছাড়াই কেন্দ্রে যেতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জামায়াত প্রার্থীর অভিযোগ, নির্বাচন বর্জনের পরিকল্পনা নেই
নির্বাচনের আগের দিন বুধবার জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা, নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনী কার্যক্রমে ব্যবহারের অভিযোগ করেন।
তিনি জানান, তাঁদের নির্বাচন বর্জনের কোনো পরিকল্পনা নেই। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি প্রশাসনের প্রস্তুতির ওপর আস্থার কথাও বলেন। তবে ১৯৯৪ সালের মাগুরা নির্বাচনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে তাৎক্ষণিক অবস্থা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ভোটার উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই প্রার্থী। উপনির্বাচন হওয়ায় ঢাকার বাইরে অবস্থানরত অনেক ভোটারের আগ্রহ কম থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন। পাশাপাশি ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের কারণে তাঁরা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে আসতে পারবেন কি না, সে প্রশ্নও তোলেন।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন ও জেলা প্রশাসন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের অংশগ্রহণেও নজর
এ আসনে নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের তুলনায় কিছুটা বেশি। ফলে নির্বাচনে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ভোটগ্রহণের সামগ্রিক চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া এলাকার সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিয়েও নির্বাচনের আগে আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক পক্ষগুলোর বক্তব্যের পাশাপাশি প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হবে সব ভোটারের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
তবে কোন প্রার্থী কত ভোট পাবেন, তা নির্ধারিত হবে ভোটগ্রহণ শেষে ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার মাধ্যমে।
ভোটারদের প্রত্যাশা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন
উপনির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের প্রত্যাশা—কোনো ধরনের বাধা, ভয়ভীতি বা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই তাঁরা যেন নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোট গণনার স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোটার উপস্থিতি এবং কেন্দ্রভিত্তিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে থাকবে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
সব প্রস্তুতি শেষে এখন অপেক্ষা ভোটের দিনের। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের ভোটাররা তাঁদের ভোটাধিকার কীভাবে প্রয়োগ করেন এবং ভোটগ্রহণ শেষে কী ফলাফল আসে, তা জানা যাবে ভোট গণনা ও আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার পর।


Comments (0)
Log in to join the discussion.
Be the first to comment.