ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী

সোমবার (৯ মার্চ) বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে গেছে। এতে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারেও বড় ধাক্কা লেগেছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দিনের শুরুতে ব্যারেলপ্রতি ১১৯ দশমিক ৫০ ডলারে উঠে যায়। পরে অবশ্য তা কমে দাঁড়ায় ১০৭ দশমিক ৮০ ডলারে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত হালকা ও স্বল্প সালফারযুক্ত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ব্যারেলপ্রতি ১১৯ দশমিক ৪৮ ডলারে উঠলেও পরে কমে ১০৩ ডলারে নেমে আসে।
যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে বেসামরিক স্থাপনাতেও। বাহরাইন অভিযোগ করেছে, ইরান তাদের একটি লবণমুক্তকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েছে, যা পানীয় জল সরবরাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, ইসরায়েলের রাতভর হামলার পর তেহরানের তেলের ডিপোগুলোতে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।
যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পারস্য উপসাগর থেকে তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো এতে জড়িয়ে পড়ায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্পোন্নত সাত দেশের জোট জি–৭-এর কিছু সদস্য বাজারের চাপ কমাতে কৌশলগত তেলের মজুদ ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির বরাত দিয়ে এ খবর প্রকাশিত হলেও এখনও অবশ্য তা নিশ্চিত নয়। তবে খবরটি প্রকাশের পর তেলের দাম কিছুটা কমে আসে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির কৌশলগত তেল মজুদ ব্যবহার করার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে পর্যাপ্ত জ্বালানি রয়েছে এবং শিগগিরই দাম কমে আসবে।
স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় কার্যত ওই প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ইরানের উত্তরে অবস্থিত এই প্রণালি দিয়ে সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়।
এদিকে, রপ্তানির সুযোগ কমে যাওয়ায় তেল উৎপাদক দেশগুলোর মজুদ ট্যাংক দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশ তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রও তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যা সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়ায় জ্বালানির মূল্যও বাড়ছে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য শিল্পে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলো এতে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এর আগে, সর্বশেষ ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর পর ব্রেন্ট ও মার্কিন ক্রুড তেলের দাম এ ধরনের উচ্চতায় উঠেছিল।
জ্বালানির উচ্চমূল্য সাধারণত মূল্যস্ফীতি বাড়ায়, যা পরিবার-পর্যায়ে বাজেটের ওপর চাপ ফেলে। এতে করে ভোক্তা খরচ কমিয়ে দেয়, আর এর ফলে দেশের অর্থনীতিতের বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সোমবার টোকিওর প্রধান শেয়ার সূচক নিক্কেই–২২৫ সূচক ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। অন্য বাজারগুলোরও অবস্থাও ছিল দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার বাজারও ১ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি নিচে নেমে যায়।
শুক্রবার এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায় এবং ডাও জোন্স সূচক একপর্যায়ে ৯৪৫ পয়েন্ট পর্যন্ত পড়ার পর প্রায় ৪৫০ পয়েন্ট কমে লেনদেন শেষ হয়। নাসডাক কম্পোজিট সূচক কমে ১ দশমিক ৬ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত গ্যাসোলিনের দাম রবিবার গ্যালনপ্রতি ৩ দশমিক ৪৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় প্রায় ৪৭ সেন্ট বেশি বলে জানিয়েছে এএএ মোটর ক্লাব। একই সময়ে ডিজেলের দাম ছিল গ্যালনপ্রতি প্রায় ৪ দশমিক ৬০ ডলার, যা এক সপ্তাহে প্রায় ৮৩ সেন্ট বেড়েছে।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট সিএনএনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে বলেন, খুব বেশি সময় লাগবে না, গ্যাসোলিনের দাম আবার গ্যালনপ্রতি ৩ ডলারের নিচে নেমে আসবে।
তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট করে সময়ের হিসাব বলা কঠিন, তবে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতেও এটি কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার মাত্র; কয়েক মাসের নয়।’
তবে বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীদের মতে, তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রবিবার ভোরে তেহরানের তেল ডিপো ও একটি পেট্রোলিয়াম স্থানান্তর টার্মিনালে ইসরায়েলের হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর দাবি, ওই ডিপোগুলো ইরানের সেনাবাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছিল।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের প্রভাব তেল শিল্পে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বর্তমানে ইরান প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে, যার বেশিরভাগই চীনে যায়। যুদ্ধের কারণে এ রপ্তানি ব্যাহত হলে চীনকে অন্য উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করতে হতে পারে, যা বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তেলের মতো না হলেও যুদ্ধের মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়েছে। রবিবার রাত পর্যন্ত প্রতি ১ হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩৩ ডলার, যা শুক্রবারের সমাপনী দামের (৩ দশমিক ১৯ ডলার) তুলনায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। গত সপ্তাহে এ দাম প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছিল।
Please login to post a comment.





















Comments
Loading comments...