সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এসসিজি) নিজের অবসরকালীন সংবাদ সম্মেলনে উসমান খাজা অত্যন্ত খোলামেলাভাবে অ্যাশেজের শুরুতে পাওয়া সমালোচনা এবং তার ক্যারিয়ারজুড়ে বর্ণবাদী স্টিরিওটাইপিং বা গৎবাঁধা ধারণার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।

পার্থ টেস্টের আগে গলফ খেলা নিয়ে খাজা সমালোচিত হয়েছিলেন, যেখানে তার প্রস্তুতি এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় তাকে। খাজা জানান, সেই ঘটনাটি তার কাছে ব্যক্তিগত আক্রমণের মতো মনে হয়েছে।

এসসিজি-তে প্রায় ৫৫ মিনিটের দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, "আমার পিঠে টান (back spasms) লেগেছিল, যা আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। কিন্তু মিডিয়া এবং সাবেক খেলোয়াড়রা যেভাবে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল—আমি দুই দিনের সমালোচনা সহ্য করতে পারতাম, কিন্তু টানা পাঁচ দিন ধরে আমাকে আক্রমণ করা হলো। অথচ এটি আমার পারফরম্যান্স নিয়ে ছিলই না।"

পার্থ টেস্টের আগে ইনজুরিতে পড়ার পর যে চুলচেরা বিশ্লেষণের মুখে তিনি পড়েছিলেন, খাজার মতে তা ক্রিকেটীয় সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

তিনি বলেন, "বিষয়টি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত, আমার প্রস্তুতি নিয়ে। সবাই যেভাবে আমার প্রস্তুতির সমালোচনা করল, সেটি ছিল ব্যক্তিগত আক্রমণের শামিল। বলা হলো—দলের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা নেই, আমি কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবি, ম্যাচের আগের দিন গলফ খেলেছি, আমি স্বার্থপর, আমি যথেষ্ট অনুশীলন করি না কিংবা আমি অলস। এগুলো সেই একই জাতিগত বৈষম্যমূলক গৎবাঁধা ধারণা (racial stereotypes), যা আমি বড় হওয়ার পথে সারাজীবন শুনে এসেছি।"

পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া খাজা, যিনি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট খেলা প্রথম মুসলিম ক্রিকেটার, জানান যে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ক্রিকেট ব্যবস্থার মধ্যে বৈষম্য অনুভব করেছেন।

তিনি বলেন, "আমি সবসময়ই নিজেকে কিছুটা আলাদা মনে করেছি, এমনকি এখনও। আমি একজন অশ্বেতাঙ্গ ক্রিকেটার। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল আমাদের সেরা দল, আমাদের গর্ব ও আনন্দের জায়গা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আমি নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা অনুভব করেছি—যেভাবে আমাকে দেখা হয়েছে বা যেভাবে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার কারণে।"

তিনি আরও যোগ করেন, "আমি এমন অসংখ্য খেলোয়াড়ের উদাহরণ দিতে পারব যারা ম্যাচের আগের দিন গলফ খেলেছে এবং ইনজুরিতে পড়েছে। আপনারা তাদের নিয়ে একটি শব্দও বলেননি। কেউ কিছু বলেনি। আমি এমনকি এমন খেলোয়াড়দের নামও বলতে পারব যারা আগের রাতে ১৫ পেগ মদ (schooners) গিলেছে এবং তারপর ইনজুরিতে পড়েছে। কেউ টুঁ শব্দটিও করেনি। সেসব ঠিক আছে। কারণ তারা তখন 'অসি ল্যারিকিন' বা মজার সব ঘরের ছেলে!"

খাজা জানান, এই ঘটনাটি তাকে মুখ খুলতে বাধ্য করেছে, যদিও তিনি তা চাননি।

"আমার মনে হয়েছে বিষয়টি সামনে আনা প্রয়োজন। আমি এগুলো নিয়ে কথা বলতে চাইনি, কিন্তু আমি চাই পরবর্তী 'উসমান খাজা'র যাত্রা যেন ভিন্ন হয়। আমি চাই তাকে আপনারা আর দশজনের মতো সমান চোখে দেখুন, সে কে হতে পারে তা নিয়ে কোনো বর্ণবাদী পূর্বধারণা পোষণ করবেন না।"

গত বছর শেফিল্ড শিল্ডের শেষ রাউন্ডে হ্যামস্ট্রিং সমস্যার কারণে না খেলে ফর্মুলা ওয়ান গ্র্যান্ড প্রিক্স দেখতে যাওয়ায় তাকে যে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল, তার সঙ্গে সতীর্থদের আচরণের তুলনা করেন তিনি।

খাজা বলেন, "একটি ম্যাচ মিস করার জন্য আপনারা আমাকে তুলোধোনা করেছিলেন, অথচ আমার আরও অনেক সতীর্থ যারা খেলছিল না, তাদের নিয়ে আপনারা একটি শব্দও বলেননি। আমি দীর্ঘদিন ধরে এসব মোকাবিলা করছি। আমি জানি মানুষ বলবে যে উজি আবারও 'রেস কার্ড' (বর্ণবাদ কার্ড) খেলছে, কিন্তু দয়া করে আমাকে বিভ্রান্ত (gaslight) করবেন না।"

বিগত বছরগুলোতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সমস্যাটি পুরোপুরি নির্মূল হয়নি বলে মনে করেন খাজা।

"এখনও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন মানসিকতা রয়ে গেছে, যার বিরুদ্ধে আমাকে প্রতিদিন লড়াই করতে হয়। যখন আমি ইনজুরিতে পড়লাম, সবাই আমার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলল। সেটিই ছিল সবচেয়ে হতাশাজনক।"

খাজা আরও স্মৃতিচারণ করেন, "২৫ বছর বয়সে আমি অস্ট্রেলিয়া দলে মানিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। আমি অন্য ছেলেদের মতো পোশাক পরতাম; আমি মদ পান না করলেও তাদের সাথে ক্লাবে যেতাম। আমি সব চেষ্টাই করেছি কিন্তু কাজ হয়নি। আমাকে তবুও দল থেকে বাদ পড়তে হয়েছে। আমি বুঝি—আমার নাম 'জন স্মিথ' নয়। যখন কোনো সিদ্ধান্ত ফিফটি-ফিফটি হওয়ার কথা, সেটি আমার পক্ষে আসে না। তাহলে আমি কেন অন্যদের মতো হওয়ার চেষ্টা করছি?"

ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী খাজা বলেন, "আমি আশা করি পরবর্তী উসমান খাজার পথচলা আরও সহজ হবে। আমরা যেন এমন এক যুগে পৌঁছাতে পারি যেখানে একজন 'উসমান খাজা' এবং একজন 'জন স্মিথ' সমমর্যাদায় দেখা হবে। আমি সারাজীবন এই পরিবর্তনের পক্ষেই লড়াই করেছি। আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ হয়েছি, কিন্তু এখনও অনেকটা পথ বাকি। কারণ অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট এখনও অনেক ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গ-প্রধান। এতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু যতক্ষণ আমরা এর পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করছি, তার চেয়ে বেশি কিছু করার নেই।"