ইরানের রাজপথে রাতভর বিক্ষোভ বাড়ছে। জনস্রোত আছড়ে পড়ছে শহরের পর শহরে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটতে পারে—এমন সম্ভাবনা এখন প্রবল হয়ে উঠছে। আর যদি সত্যিই তা ঘটে, তবে বিশ্ব ভূ-রাজনীতি এবং জ্বালানি তেলের বাজারে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

**বিক্ষোভের বর্তমান পরিস্থিতি**
গত দুই সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন রাজধানী তেহরান ছাড়িয়ে দেশের অন্তত ডজনখানেক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। ৯ কোটি মানুষের এই দেশটিতে গত সপ্তাহান্তে লক্ষ লক্ষ মানুষ সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গত দুই সপ্তাহে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ৫০০ জন নিহত হয়েছেন এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরাসরি বর্তমান শাসনের পতনের দাবিতে রূপ নিয়েছে।

**ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান ও সামরিক হুমকি**
ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোর পতনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজর এখন ইরানের দিকে। তিনি বারবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা বন্ধ না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে। এয়ার ফোর্স ওয়ান-এ সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, "আমরা পরিস্থিতি খুব গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছি। সামরিক বাহিনী শক্তিশালী কিছু বিকল্প নিয়ে কাজ করছে।" এমনকি ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ সচল করতে তিনি ইলন মাস্কের 'স্টারলিঙ্ক' ব্যবহারের ইঙ্গিতও দিয়েছেন।

**জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা**
ইরান ওপেক-ভুক্ত চতুর্থ বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। দেশটিতে অস্থিরতার জেরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম ৫ শতাংশেরও বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৬৩ ডলার ছাড়িয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা আসতে পারে।


বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের বর্তমান শাসনের পতন হলে তা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য হবে এক বিশাল ধাক্কা। সিরিয়ার আসাদ সরকার এবং ভেনেজুয়েলার মাদুরোর পর ইরানকেও হারালে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রভাব প্রায় নিঃশেষ হয়ে যাবে। অন্যদিকে, ইসরায়েল এই পরিস্থিতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখছে।


সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক উইলিয়াম উশার বলেন, "১৯৭৯ সালের পর ইরানের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় সংকট। অর্থনৈতিক ধস এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি।" তবে ব্লুমবার্গের বিশ্লেষক দিনা এসফান্দিয়ারি মনে করেন, শাসনের পূর্ণ পতন না হয়ে সেনাবাহিনী বা রেভল্যুশনারি গার্ডের (IRGC) মাধ্যমে ক্ষমতা রদবদল হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান টিভিতে সমঝোতার সুর দিলেও বিক্ষোভকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অনুগত বাহিনী চরম দমন-পীড়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ইরান কি আরেকটি বিপ্লবের পথে হাঁটবে, নাকি রক্তের বন্যায় এই বিক্ষোভ দমন করা হবে—সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।

---
সূত্র: এনডিটিভি ও ব্লুমবার্গ (১৩ জানুয়ারি, ২০২৬)