দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের জাতীয় ডাটাবেজ ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ (NEIR) চালুর পর দেশের টেলিকম খাতের এক ভয়াবহ ও অভাবনীয় চিত্র সামনে এসেছে। সরকারের তথ্য প্রযুক্তি উপদেষ্টা ফাইজ তাইয়েব আহমেদ তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে জানিয়েছেন, দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে বর্তমানে লক্ষ লক্ষ ক্লোন বা ভুয়া আইএমইআই (IMEI) সম্পন্ন হ্যান্ডসেট সক্রিয় রয়েছে। একইসঙ্গে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই এবং কোনো সচল সেট এখনই বন্ধ হচ্ছে না।




ক্লোন ফোনের ভয়াবহ পরিসংখ্যান

উপদেষ্টার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে আইএমইআই জালিয়াতির চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একটি নির্দিষ্ট আইএমইআই নাম্বার (যেমন: 99999999999999) ব্যবহার করে প্রায় ৩ কোটি ৯১ লক্ষেরও বেশি কম্বিনেশন পাওয়া গেছে। এছাড়া ‘০’ বা ‘১’ এর মতো সহজ প্যাটার্নের কয়েক লক্ষ ভুয়া আইএমইআই নেটওয়ার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকি একটিমাত্র আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে সাড়ে ১৯ লক্ষ পর্যন্ত ডুপ্লিকেট ডিভাইস বাজারে ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এই বিশাল সংখ্যক ক্লোন ফোনের অস্তিত্ব কেবল বাণিজ্যিক জালিয়াতি নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল জালিয়াতি ঘটে এসব অনিবন্ধিত ডিভাইসে। ২০২৩ সালের ই-কেওয়াইসি (e-KYC) জালিয়াতির ৮৫ শতাংশই ছিল অবৈধ বা পুনঃপ্রোগ্রাম করা ফোনের মাধ্যমে।

গ্রাহকদের জন্য স্বস্তি: বন্ধ হচ্ছে না হ্যান্ডসেট

এনইআইআর চালু হলেও সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বড় সুখবর হলো, আগামী ৯০ দিন কোনো অবৈধ বা ক্লোন করা হ্যান্ডসেট বন্ধ করা হবে না। উপদেষ্টা স্পষ্ট করেছেন যে, সরকার জনজীবনে অসুবিধা সৃষ্টি করতে চায় না। এসব সেটকে বন্ধ না করে ‘গ্রে’ (Grey) তালিকাভুক্ত করে রাখা হবে। মূলত যারা অজান্তে নকল ফোন কিনে প্রতারিত হয়েছেন, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য।

ডাটাবেজ জটিলতা ও এনআইডি ম্যাপিং

বর্তমানে অনেক গ্রাহক তাদের এনআইডি-র বিপরীতে অতিরিক্ত সিম বা ডিভাইসের সংখ্যা দেখে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে প্রায় তিন বিলিয়নের বেশি ঐতিহাসিক (Historic) ডেটা সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে মাইগ্রেশনের সময় পুরনো ডেটাও বর্তমানে সচল হিসেবে দেখাচ্ছে। বিটিআরসি এবং অপারেটররা যৌথভাবে এই ডেটা আর্কাইভ করার কাজ করছে, যা সম্পন্ন হলে এনআইডি-র বিপরীতে শুধুমাত্র বর্তমানে সচল হ্যান্ডসেটের সঠিক সংখ্যা দেখা যাবে।

নিরাপত্তার বিষয়ে উপদেষ্টা জানান, ডাটাবেজ সুরক্ষায় 'JWT' টোকেন এবং 'রেট লিমিট' ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এনআইডি নম্বর দিয়ে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে যে সহজলভ্যতা পরিলক্ষিত হয়েছে, সেখানে নিরাপত্তার আরও একটি স্তর (Layer) যুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কেন এই উদ্যোগ অপরিহার্য?

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ক্লোন ও নকল ফোনের মাধ্যমে চুরি হওয়া মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ফোন চুরি হলেও তা উদ্ধার না হওয়ার অন্যতম কারণ এই আইএমইআই জালিয়াতি। এছাড়া রেডিয়েশন টেস্টহীন এসব নিম্নমানের ফোন জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

উপদেষ্টার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এনইআইআর ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন নাগরিক তার এনআইডি-র বিপরীতে কতটি ডিভাইস বা সিম চলছে তা জানতে পারবেন। এটি নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনলাইন জুয়া, মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি এবং আর্থিক অপরাধ দমনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।


শুরুর দিকে কারিগরি কিছু জটিলতা থাকলেও এনইআইআর ব্যবস্থাটি ডিজিটাল বাংলাদেশের নিরাপত্তায় এক অপরিহার্য স্তম্ভ। অবৈধ ফোনের এই চক্রের লাগাম টেনে ধরতে এবং ডিজিটাল লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে সরকারের এই কঠোর অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে স্মার্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতারক চক্রকে চিহ্নিত করাই হবে এখনকার প্রধান চ্যালেঞ্জ।